আজ ২১ শে জুন বিশ্ব হাইড্রোগ্রাফি দিবস

প্রকাশিত: ৬:০৩ অপরাহ্ণ, জুন ২১, ২০২০

স্টাফ রিপোর্টার : বিশ্ব হাইড্রোগ্রাফি দিবস । সমুদ্র, সমুদ্র সম্পদ ও সমুদ্রপথের সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনায় হাইড্রোগ্রাফির গুরুত্ব তুলে ধরার লক্ষ্যে বিশ্বের অন্যান্য দেশের ন্যায় আজ রবিবার ২১শে জুন বাংলাদেশেও বিশ্ব হাইড্রোগ্রাফি দিবস পালিত হচ্ছে। বিশ্ব হাইড্রোগ্রাফিক সংস্থার (IHO-International Hydrographic Commision) সকল সদস্যরাষ্ট্রে ২০০৬ সাল থেকে এই দিবসটি পালিত হয়ে আসছে।

এ বিষয়ে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ওশানোগ্রাফি ডিপার্টমেন্টের সহযোগী অধ্যাপক ও যুক্তরাষ্ট্রের বিখ্যাত হাইড্রোগ্রাফিক সেন্টার সিকম (CCOM) এর হাইড্রোগ্রাফিতে ক্যাটাগরি এ গ্রাজুয়েট ড. মোহাম্মদ মোসলেম উদ্দীন মুন্না টেলিফোন বার্তায় লাইট হাউস নিউস ক্লাবকে বলেন, এ বছর দিবসটির প্রতিপাদ্য বিষয় “হাইড্রোগ্রাফি-স্বয়ংক্রিয় প্রযুক্তির উৎকর্ষতায়’। সমুদ্রে নিরাপদ জাহাজ চলাচল, সামুদ্রিক পরিবেশ ও সমুদ্র সম্পদের টেকসই ব্যবহার ও তার নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করে ব্লু ইকোনমির উন্নয়নের ক্ষেত্রে নিখুত হাইড্রোগ্রাফিক জরীপ ও উন্নত হাইড্রোগ্রাফি ম্যাপের গুরুত্ব অপরিসীম। তিনি আরো জানান, বিশ্ব অর্থনীতির উৎপাদিত পণ্যসামগ্রী বাজারজাতকরণের জন্য সাগর-মহাসাগর অন্যতম নিয়ামক হিসেবে কাজ করে। বিশ্ব বাণিজ্যের শতকরা নব্বই ভাগের বেশি মালামাল সমুদ্রের মাধ্যমে পরিবহন করা হয়। সমুদ্রে এ সকল জাহাজের নিরাপদ চলাচলের জন্য সমুদ্রের তলদেশ সম্পর্কে সম্যক জ্ঞান থাকা একান্ত প্রয়োজন। হাইড্রোগ্রাফিক সার্ভের মাধ্যমে সমুদ্রে নিরাপদ চলাচলের লক্ষ্যে নটিক্যাল চার্ট তৈরি ও পাবলিকেশনের মাধ্যমে প্রয়োজনীয় তথ্যসমূহ সরবরাহ করে থাকে।

 

এ ছাড়া সমুদ্র তলদেশের আকৃতি-প্রকৃতি ও বিভিন্ন বৈশিষ্ট্যসমূহ বিশ্লেষণের মাধ্যমে সমুদ্র পৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, তেল-গ্যাস অনুসন্ধান, ড্রেজিং, অফশোর কন্সট্রাকশন, ক্যাবলস ও পাইপলাইন স্থাপন, টেলিকমিউনিকেশন্স, আবহাওয়া ও জলবায়ু বিজ্ঞান, সামুদ্রিক পরিবেশ পর্যবেক্ষণ, অ্যাকুয়াকালচার, ফিশিং, বায়োমেডিসিন, সমুদ্র পর্যবেক্ষণ ইত্যাদি কার্যক্রমে এবং গবেষণার সাফল্য বহুলাংশে হাইড্রোগ্রাফি ম্যাপের সঠিকতা ও স্পষ্টতার উপর নির্ভর করে। যা একদিকে অর্থনীতিতে টেকসই উন্নয়নে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখতে সাহায্য করবে, অন্যদিকে অনেক বেশি কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করবে। তিনি উল্লেখ করেন, বিষয়টির গুরুত্ব অনুধাবন করে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ২০১১ সাল থেকে ওশানগ্রাফি বিভাগের সিলেবাসে হাইড্রোগ্রাফি কোর্স সংযোজন করেছে। পরবর্তীতে অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়য়ে ও এখন এ কোর্সটি পড়ানো হচ্ছে।

প্রসঙ্গত, বাংলাদেশ নৌবাহিনীর হাইড্রোগ্রাফি বিভাগ (BNHOC) হল বাংলাদেশ সরকারের অনুমোদিত জাতীয় সংস্থ যারা সমুদ্রে নিরাপদ নেভিগেশনের জন্য বঙ্গোপসাগরের উপকূলীয় ও গভীর সমুদ্রের আন্তর্জাতিক মানের চার্ট ও ম্যাপ তৈরি এবং প্রকাশ করে। নৌবাহিনীর তৈরিকৃত চার্টসমূহ বিশ্বব্যাপী মেরিনাররা তাদের বাণিজ্যিক জাহাজসমূহের সমুদ্রে নেভিগেশনের জন্য ব্যবহার করছে। এ ছাড়া বাংলাদেশ নৌবাহিনী ইলেক্ট্রনিক নেভিগেশনাল চার্ট তৈরির সামর্থ অর্জন করেছে যা বিশ্বব্যাপী সমাদৃত ও স্বীকৃত। এতে বিশ্ব অর্থনীতির সাথে সম্পৃক্ত বিভিন্ন বিষয় যেমন সমুদ্র পথে ব্যবসা বাণিজ্যের প্রসার, সমুদ্রের প্রাকৃতিক সম্পদ আহরণ, সমুদ্র বিজ্ঞান ও গবেষণা, প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তার বিষয়ে বাংলাদেশ অবদান রাখতে পারছে অ্যান্ড জাতীয় ভাবে লাভবান হচ্ছে।


সমগ্র বিশ্বের প্রায় ৭১% এলাকা সাগর ও মহাসাগর দ্বারা পরিবেষ্টিত এবং বিশ্ব বাণিজ্যের প্রায় ৯০% ই সমুদ্র পথে পরিচালিত হচ্ছে। সমুদ্র পাড়ি দেয়ার সময় সবচেয়ে বড় ঝুঁকি হচ্ছে যাত্রা পথের অজানা বিভিন্ন বাধা যেমন ডুবোচরের উপস্থিতি, ডুবন্ত জাহাজ ইত্যাদি। বিভিন্ন দেশের হাইড্রোগ্রাফি বিভাগ নেভিগেশানাল চার্ট এবং ম্যাপ সমুদ্রে নিরাপদ জাহাজ চলাচলের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে। এ ছাড়া সমুদ্রে বিভিন্ন কর্মকান্ড যেমন তেল/গ্যাস অনুসন্ধান, ড্রেজিং কর্মকান্ড, স্থাপনা নির্মাণ, সমুদ্র পরিবেশ পর্যবেক্ষণ, একুয়াকালচার, খনিজ অনুসন্ধান, জ্বালানী, বায়োমেডিসিন এবং ওশানোগ্রাফিক গবেষণা কার্য পরিচালনার জন্য হাইড্রোগ্রাফিক কর্মকান্ডের গুরুত্ব অপরিসীম। বাংলাদেশ ছোট দেশ হলেও তার হাইড্রোগ্রাফিক সক্ষমতা সারা বিশ্বে প্রশংসিত। বাংলাদেশের প্রকাশিত হাইড্রোগ্রাফিক চার্ট ও পাবলিকেশান্সসমূহ আন্তর্জাতিক মানের হওয়ায় তা সারা বিশ্বের নাবিকদের নিকট গ্রহণযোগ্যতা পেয়েছে এবং সমুদ্র পথে দেশের ব্যবসা বাণিজ্যের প্রসারে তা বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। ইতিমধ্যে মায়ানমার ও ভারতের সাথে আমাদের সমুদ্রসীমা নির্ধারিত হওয়ায় বিশাল সমুদ্র এলাকা আমাদের অধিকারে এসেছে। ভবিষ্যতে সমুদ্র এলাকায় বিভিন্ন ধরণের গবেষণা ছাড়াও সমুদ্র সম্পদ আহরণসহ অনেক কার্যক্রম গ্রহণের মাধ্যমে হাইড্রোগ্রাফির গুরুত্ব আরো বৃদ্ধি পাবে বলে আশা করা যায়। 

সমুদ্র পথের নিরাপত্তায় ও সমুদ্র সম্পদের ব্যবস্থাপনায় হাইড্রোগ্রাফির গুরুত্ব তুলে ধরতে ব্লু গ্রিন ফাউন্ডেশন, দ্য লাইট হাউজ ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ এবং রেডিয়ান্ট ওশান রিসার্চ এন্ড এডুকেশন সেন্টারের সমন্বিত উদ্যোগে বাংলাদেশ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এক ভার্চুয়াল আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়।

 

এই আলোচনায় অংশগ্রহন করে ব্লু গ্রিন ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ এর প্রেসিডেন্ট অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ মোসলেম উদ্দীন মুন্না সকলের মাঝে ওয়ার্ল্ড হাইড্রোগ্রাফি দিবসের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দিক তুলে ধরেন। দিবসটি উপলক্ষে, এতে রেডিয়ান্ট ওশান রিসার্চ এন্ড এডুকেশন সেন্টার এর প্রতিষ্ঠাতা এবং রেডিয়েন্ট গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক, জনাব শফিকুর রহমান চৌধুরী বলেন, বিকাশমান ব্লু ইকোনমির সঙ্গে হাইড্রোগ্রাফির সম্পৃক্ততা বিবেচনায় সরকারের প্রত্যক্ষ পৃষ্ঠপোষকতায় হাইড্রোগ্রাফিক ও ওশানোগ্রাফিক জাহাজ সংযোজন এবং গবেষণাধর্মী কর্মকাণ্ডের ফলে বাংলাদেশের সমুদ্র সম্পদ পর্যবেক্ষণ এবং রক্ষায় আমাদেরকে অনেকদূর এগিয়ে দিয়েছে। এ ব্যাপারে তিনি সরকারের বিভিন্ন রকম যুগোপযোগী পদক্ষেপের প্রশংসা করেন। লাইট হাউজ ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ এবং রেডিয়েন্ট ফিস ওয়ার্ল্ড এর পরিচালক জনাব মোঃ আব্দুল্লাহ ভূঁইয়া শাহাদাত বলেন, ভারত ও মিয়ানমারের সঙ্গে সমুদ্রসীমা নির্ধারিত হওয়ায় বাংলাদেশের বিশাল সমুদ্রসীমায় বিভিন্ন ধরনের গবেষণা কার্যক্রম ছাড়াও সমুদ্র সম্পদ আহরণে বর্তমান সরকার অনেক কার্যক্রম হাতে নিয়েছে, এর ফলে ভবিষ্যতে হাইড্রোগ্রাফির গুরুত্ব আরও বৃদ্ধি পাবে।