বিশ্ব হাইড্রোগ্রাফি দিবস কি, কেন এবং এ বছরের প্রতিপাদ্য

প্রকাশিত: ১১:০৫ পূর্বাহ্ণ, জুন ২২, ২০২০

২১শে জুন, বিশ্ব হাইড্রোগ্রাফি দিবস। নিরাপদ সমুদ্র ভ্রমন, সমুদ্র ও সমুদ্র সম্পদের সুষ্ঠ ব্যবস্থাপনায় হাইড্রোগ্রাফির গুরুত্ব ও তাৎপর্য তুলে ধরার লক্ষ্যে সারা বিশ্বে প্রতিবছর ২১শে জুন বিশ্ব হাইড্রোগ্রাফি দিবস পালিত হচ্ছে। আন্তর্জাতিক হাইড্রোগ্রাফিক সংস্থা বা আইএইচও (IHO-International Hydrographic Organization)’র সকল সদস্যরাষ্ট্র ২০০৬ সাল থেকে এই দিবসটি পালিন করে আসছে। কিন্তু সংশ্লিষ্ট দপ্তর ও সংস্থা গুরুত্ব সহকারে এ দিবসটি পালন করলে ও আমাদের দেশের বেশীর ভাগ মানুষ এমনকি শিক্ষিত সচেতন সমাজ ও রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিবর্গ যারা এতদসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সিদ্ধানত গ্রহণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন তাদের কাছেও এ বিষয়, এ দিবস ও দিবসের তাৎপর্য খুব বেশী পরিস্কার নয়। তাই আজকের এ দিনে আসুন আমরা হাইড্রোগ্রাফি, হাইড্রোগ্রাফি দিবসের ঐতিহাসিক তাৎপর্য ও আইএইচও’র সাথে পরিচিত হই।

হাইড্রোগ্রাফি কি ও কেন?
মানুষ বিশ্বের যে কোন জায়গায় ভ্রমনের সময় যাতে নির্ভুলভাবে স্বল্প সময়ে গন্তব্যে পৌছাতে পারে এবং প্রতিটা মুহূর্তে তারা কোন জায়গায় আছে তা খুঁজে বের করার জন্য সাথে একটি মানচিত্র নিয়ে যায় অথবা ম্যাপ বা মানচিত্র ব্যাবহার করে। একইভাবে, বিশাল মহাসাগর, সমুদ্র এবং নদীর মতো জলাশয়ে নৌযাত্রা নিরাপদ ও সুরক্ষা নিশ্চিত করার জন্য জাহাজ বা নৌকাগুলি হাইড্রোগ্রাফিক মানচিত্রের সহায়তা নেয়। যে পদ্ধতি, কর্মকৌশল ও বিজ্ঞান ব্যাবহার করে সমুদ্রের গভীরতাসহ তথ্য উপাত্ত সংগ্রহ করে হাইড্রোগ্রাফিক চার্ট বা ম্যাপ তৈরী করা হয় তাকে ই হাইড্রোগ্রাফি বলা হয়। তবে বাস্তবিক পক্ষে হাইড্রোগ্রাফির সংজ্ঞা ও কর্ম পরিধি আরও ব্যাপক। ডিকশেনারীতে পৃথিবীর জলভাগের গুনাগুণ নির্ণয়, উহার গভীরতা নির্ণয় ও মানচিত্রাঙ্কন প্রভৃতি সংক্রান্ত বিজ্ঞানকে ই হাইড্রোগ্রাফির অর্থ হিসেবে লিখা হয়েছে। সংক্ষেপে হাইড্রোগ্রাফি বলতে সমুদ্র, হ্রদ এবং নদীনালার মতো জলাভূমির জরিপ ও চার্ট করার বিজ্ঞান বলা হলে ও প্রকৃত পক্ষে হাইড্রোগ্রাফি হ’ল ফলিত বিজ্ঞানের (Applied Science) গুরুত্বপূর্ণ শাখা যা মহাসাগর, সাগর, উপকূলীয় অঞ্চল, হ্রদ এবং নদীনালা তথা জলাভূমির ভৌত কাঠামোগত বৈশিষ্ট্যগুলির পরিমাপ ও বর্ণনার পাশাপাশি সময়ের সাথে তাদের পরিবর্তনের পূর্বাভাস নির্ণয় করে যার মূল উদ্দেশ্যে নেভিগেশনের নিরাপত্তার হলেও টেকসই অর্থনৈতিক উন্নয়ন, প্রতিরক্ষা, বৈজ্ঞানিক গবেষণা এবং পরিবেশ সুরক্ষা সহ অন্যান্য সামগ্রিক সামুদ্রিক কার্যক্রমে বিশেষ অবদান রাখে। সুতরাং, নিরাপদ ও দক্ষ নৌযাতায়াতের পাশাপাশি হাড্রোগ্রাফি সমুদ্রে পরিচালিত যেকোনো কার্যক্রমে অবদান রাখছে বিশেষ করেঃ
-টেকসই সম্পদ আহরণ
-মাৎস্য ধরা ও খনিজ উত্তলন
-পরিবেশ সুরক্ষা ও ব্যবস্থাপনা
-সমুদ্র সীমানা নির্ধারণ
-জাতীয় সামুদ্রিক ভূ-স্থানীক ডেটার অবকাঠামো তৈরি সামুদ্রিক প্রতিরক্ষা ও সুরক্ষা
-সুনামি, ঘূর্ণিঝড়, বন্যা ও জলাবধ্যতার মডেলিং
-উপকূলীয় অঞ্চলের ব্যবস্থাপনা
-পর্যটন এবং
-সমুদ্র বিজ্ঞান

হাইড্রোগ্রাফি দিবসের ঐতিহাসিক পটভূমি :
প্রতি বছর ২১শে জুনে আন্তর্জাতিক হাইড্রোগ্রাফি দিবস পালিত হয়। আন্তর্জাতিক হাইদ্রগ্রাফিক সংস্থা (আইএইচও) ২০০৫ সালে ২১শে জুন কে হাইড্রোগ্রাফি দিবস হিসেবে পালন করার নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়েছে ও ২০০৬ সাল থেকে পালন করে আসছে। ১৯২১ সালে প্রতিষ্ঠিত আন্তর্জাতিক হাইড্রোগ্রাফিক ব্যুরো (IHB) পরিবর্তিত হয়ে ১৯৭০ সালে আন্তর্জাতিক হাইড্রোগ্রাফিক অর্গানাইজেশন (IHO) নাম ধারণ করে। সংস্থাটির প্রতিষ্ঠার মূল উদ্যেশ্য ছিল নিরাপদ নেভিগেশন, প্রযুক্তির মান ও পরিবেশ সুরক্ষার মত বিষয় গুলোতে আন্তঃসরকার পর্যায়ে আলোচনা ও পরামর্শের ব্যবস্থা করা। আন্তঃসরকারীয় সংস্থাটি বিশ্বের সমস্ত মহাসাগর, সমুদ্র ও নৌচলাচলের জলাধারের সমীক্ষা ও চার্ট সম্পন্ন হওয়া নিশ্চিত করতে কাজ করছে। জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ ২০০৫ সালে প্রতিবছর ২১শে জুনে বিশ্ব হাইড্রোগ্রাফি দিবস পালনের আইএইচও’র প্রস্তাব গ্রহন করে । দিনটি পালনের মূল লক্ষ্য হল হাইড্রোগ্রাফি সম্পর্কে জনগণকে সচেতন করা যা প্রতিটা মানুষের জীবনের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ।

বিশ্ব হাইড্রোগ্রাফি দিবস ২০২০ এর প্রতিপাদ্যঃ
এ বছর দিবসটির প্রতিপাদ্য বিষয় হচ্ছে, ‘হাইড্রোগ্রাফি-স্বয়ংক্রিয় প্রযুক্তির উৎকর্ষতায়’ যা স্বয়ংক্রিয় প্রযুক্তি উদ্ভাবনে হাইড্রোগ্রাফির গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা তুলে ধরে। এর মধ্যে রয়েছে আকাশ, সমুদ্র পৃষ্ঠ ও সমুদ্র তলে ব্যবহৃত ড্রোন ও য়ংক্রিয় জাহাজ । স্বয়ংক্রিয় প্রযুক্তির ব্যবহার নতুন কিছু নয়: নাবিকরা কয়েক দশক ধরে অটোপাইলটিং এর মতো স্বয়ংক্রিয় সিস্টেম ব্যবহার করে আসছে। তবে অতিসম্প্রতি ওয়েভ গ্লাইডারের মতো মনুষ্যবিহীন নৌযানের ব্যাবহার সমুদ্র বিজ্ঞানের অগ্রগতিতে সহায়তা করে চলেছে। এছাড়া আমরা স্বয়ংক্রিয় প্রযুক্তির মাত্রা এবং এর আরও বিস্তৃত অ্যাপ্লিকেশন প্রত্যক্ষ করছি। নরওয়ের মতো দেশগুলি স্বয়ংক্রিয় প্রযুক্তির ফেরির সফল পরীক্ষা চালাচ্ছে। স্বয়ংক্রিয় প্রযুক্তির জরিপ জাহাজ এখন সমুদ্রতলের অভিনব এবং অপ্রত্যাশিত তথ্যও সরবরাহ করছে। তবুও আরও নিরাপদ, সুরক্ষিত এবং পরিবেশবান্ধব স্বয়ংক্রিয় প্রযুক্তির মেরিটাইম সারফেস শিপস (এমএএসএস) কার্যক্রমের বিকাশের জন্য সার্টিফাইড আপ টু ডেট হাইড্রোগ্রাফিক তথ্য প্রয়োজন। অদূর ভবিষ্যতে এই তথ্য স্বয়ংক্রিয় প্রযুক্তির সারফেস যানবাহন (এএসভি) নিজেই বা স্বয়ংক্রিয় প্রযুক্তি আন্ডারওয়াটার যানবাহন (এওভি) সরবরাহ করতে পারবে। ফ্লাইং ড্রোনগুলি এখন হালকা ওজনের মাল্টিবিয়াম লাইডার সেন্সর বহন করে, উপকূলীয় ও উপকূলের কাছাকাছি পরিবেশের উচ্চতর নির্ভুল ও উচ্চ-রেজোলিউশন বাথিমেট্রি ডেটা সরবরাহ করতে সক্ষম হচ্ছে। এটি একই সাথে এই প্রযুক্তিগুলির জন্য একটি পরীক্ষার ক্ষেত্র সরবরাহ করার সাথে সাথে আন্ডারসারভিয়েড অঞ্চলগুলির কভারেজ বাড়াতে সহায়তা করবে ।

লেখক ও গবেষক

ড. মোহাম্মদ মোসলেম উদ্দীন মুন্না

সহযোগী অধ্যাপক

ওশানোগ্রাফি ডিপার্টমেন্ট, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।

যুক্তরাষ্ট্রের বিখ্যাত হাইড্রোগ্রাফিক সেন্টার সিকম (CCOM) এর হাইড্রোগ্রাফিতে ক্যাটাগরি এ গ্রাজুয়েট।

প্রেসিডেন্ট, ব্লু গ্রীন ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ।

উপদেষ্টা, রেডিয়েন্ট ফিস ওয়ার্ল্ড, কক্সবাজার।